আর মাইরেন না ভাই ,আপনাদের দুইটা পায়ে ধরি ,আমি রোজা

Spread the love

মা’রতে মা’রতে একটা সময় মুখ থেকে বের হলো আর মাইরেন না ভাই আমি রোজা রাখছি । আর আপনাদের এলাকায় আসবোনা ,এমন কথা শুনে যে লোক গুলা ছিলো সবাই হঠাৎ থমকে গেলো ।

লোক গুলা জিজ্ঞেস করলো বাড়ি কোথায় তর? ছেলেটা চুপ থেকে ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলো

– কলাবাগান বস্তিতে ভাই ।

তুই এইটুকু ছেলে তর কলিজা কতো বড় মসজিদ থেকে চু’রি করতে আসছস !

এরকমটা চলার মধ্যেখানে হঠাৎ পাশ থেকে লোকজন বলে উঠলো ভাই থামলেন কেনো ? আরো দেন কয়ডা রোজার মাসে চু’রি করে বেরায় । লাত্থি দেন আরো কয়েকটা ,ঐ বেটা রোজার মাসে চু’রি করে বেরাস তুই আবার কিসের রোজা রাখসরে । এসব মিছা কথা কওয়ার জায়গা পাসনা । এ কথা বলেতে না বলতে লোকটা কানের নিচে আবার বড়জোরে একটা কসিয়ে থাপ্পর বসিয়ে দিলো ।

ছেলেটার গালে হাতের দাগ বসে আছে ভালোই বুঝা যাচ্ছে । চিৎকার চেচামেচি শুনে মসজিদের কর্তব্যরত ইমাম সাহেব মসজিদের দুতলা থেকে তাড়াতাড়ি করে নেমে এলো । এসে দেখলো একটা ছেলে কান্না ভেজা চোখ নিয়ে দেয়াল ঘেসে বসে আছে । আর মসজিদের আঙিনায় অনেক লোক জমাট বেদে আছে আজকে মসজিদে ইফতার এর বড়সর আয়োজন করা হয়েছে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে । ইমাম সাহেব এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন এই কি হয়েছে এখানে এতো ভীড় কেনো ।

-এই হট্টোগোলের মধ্যে কিছু লোক চেচিয়ে বলে উঠলো হুজুর চো’র ধরছি চো’র !

ইমাম হুজুর সামনে ভিড়ের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলেন ছেলেটাকে বেশী একটা বয়স হবেনা বড়জোর ১২ থেকে ১৩ বছরের একটি ছেলে ।গালগুলা ভিজা ভালোই কান্না করেছে বুঝা যাচ্ছে ।দেয়াল ঘেসে গালে হাত দিয়ে ছেলেটা বসে আছে । ছেলেটার গালে মা’র এর দাগগুলা স্পস্ট বুঝা যাচ্ছে ছেলেটা কালো হলেও মার’টা বেশীই পরেছে ।

হুজুর সামনে এগুতে ছেলেটার হাত পা কাপা শুরু করলো ছেলেটা আরো ভয় পেয়ে গেলো ,হুজুর চলে আসছে এবার বোধহয় আর রেহাই পাবেনা সে ।

হুজুর কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলো

– কি চু’রি করেছো তুমি দেখি !

পাশ থেকেই দাড়ানো একজন লোক হুট করে একটা পলিথিনের প্যাকেট হুজুরের সামনে এগিয়ে দিলেন ,এগিয়ে  দিয়ে বললেন দেখেন হুজুর । মসজিদের ভিতরে সবাই ইফতারের আয়োজন করা নিয়ে ব্যাস্ত আর এই ফাক দিয়ে শালায় পলিথিনে এগুলা ভইরা লইছে ।হুজুরে এক্কেরে বেটারে হাতেনাতে ধরছি ।

হুজুর এগিয়ে গিয়ে লোকটার হাত থেকে পলিথিনটা নিজের হাতে নিলেন এবং তিনি সবার সামনে পলিথিনটা খুললেন । খুলে দেখলেন যে পলিথিনটা ভিতরে আধা কেজির মতো জিলাপী, ৬ টা আপেল আর কয়েকটা খেজুর ছিলো ।

হুজুর একটা দীর্ঘস্বাস নিয়ে বললেন ,তাই বলে ছেলেটাকে এভাবে গনপিটুনি দিয়েছো কেনো ,ছোট বাচ্চাদের কেউ এভাবে মা’রে নাকি ! ছেলেটাতো রোজা রেখেছে ।

ওনার মুখ থেকে এ কথা শুনার পর জরো হওয়া সব লোকদের উত্তেজনা হালকা ইকটু কমে এলো । এবার হুজুর ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলেন !

হুজুর ‍ জিগাইলো তোমার বাপে কি করে ?

ছেলেটা এতক্ষনে ইকটুখানি স্বস্তি ফিরে পেলো আর বললো হুজুর আমার বাপে আগে সাইকেল ঠিক করতো । অহন বাপের অনেক অসুক কোনো কাম করতে পারেনা ,ঘরে কোনো খাওন নাই । হুজুর আমারে আপনি এইবারের মতো ছাইরা দেন । আমি কোনোদিন চু’রি করিনাই কয়েকটা বাসায় গেছিলাম হাত পাইত্তা একটা দানাও সাহায্য খুজে পাইনাই ।

হাটতে হাটতে দেখি মসজিদের ভিতরে ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে ।মসজিদের খাবার দেইখা বাড়ি লইয়া যাওয়ার জন্য কিছু খাওন তুইলা লইছি । আমারে মাফ কইরা দেন হুজুর  আমার অনেক বড় ভূল হয়ে গেছে ।

পাশ থেকে লোকগুলা চেচিয়ে বলে উঠলো হুজুর ওর কথা বিস্বাস কইরেন না এগুলা সব মি’ছা কথা চু’রিতো একে করছেই আবার ভ’দ্রলোক সাজতে আসছে ওর কথা কানে নিয়েন না । হুজুর তখনি ইকটু বিরক্তির সুর নিয়ে বললেন সত্য মিথ্যা এখন যাচাই করতে হবেনা । ইফতার শেষ হলে সবাই তারা বাসায় গিয়ে সত্য মিথ্যা যাচাই করবো ।যদি এমনটা হয়ে থাকে তাহলে ছেলেটার বাবার কাছে বলে তাকে সাবধান করে দিতে বলবো । ছেলেটা অনেক হাপিয়ে গেছে তাকে কেউ পানি দাও ।

পাশ থেকে কেউ একজন পানির বোতল এগিয়ে দেয় আর তখনি ছেলেটা বলে উঠলো আমি রোজা রেখেছি ।

এবার ইমাম সাহেব মুখ তুলে পাশে দাড়িয়ে থাকা লোকদের দিকে বিরক্তিকর চেহারা নিয়ে তাকালেন ,ছেলেটাকে ইমাম সাহেব অযু করালেন এবং তিনি তার পাশে বসিয়ে ছেলেটাকে ইফতার করালেন । ইফতার শেষে জামাতে নামাজ আদায় করে নিলেন । এবার ইমাম সাহেব এলাকার দুইজন লোক এবং ছেলেটাকে নিয়ে ছেলেটার বাসার উদ্দেশ্য  রওনা হলো ।

হুজুর গিয়ে দেখলেন বস্তির ভিতরে একচালা একটা টিনের  ঘর ,ঘরের সামনে বাইরের দুয়ারে ছেলেটার বাবা বসে আছে । তখন ইমাম সাহেব ও লোক দুইটা গিয়ে বসলেন এবং ছেলেটার বাবাকে ইমাম সাহেব সবকিছু খুলে বললেন ,আর এসব কথা শুনে ছেলেটার বাবা তাকে রেগে মেগে থাপ্প’র দেওয়ার জন্য এগিয়ে গেলেন এমন সময় ইমাম সাহেব বাদা দিয়ে বললেন অনেক হইছে ওর মা’র ওরে আর কেউ কিছু বইলেন না।

ছেলেটার বাবা তখন কাদতে কাদতে ইমাম সাহেবরে কইলেন ,বিস্বাস করেন হুজুর আমি আমার পোলাপানগো কখনো এমন শিক্ষা দেইনাই । আমার শরীরটা অনেক দিন দইরা ভালো যাইতাছেনা ।কাম কাজ করতে না পারার কারনে সংসারে পোলাপানগো ঠিকমতো খাওন যোগাতে পারিনা । তয় আমার পোলায় যে এমন একটা কাম করবো আমি কোনোদিন কল্পনা করিনাই । ও এমন প্রকৃতির পোলানা হুজুর ।

এর মাঝখান দিয়ে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে ছে’লেটার একটি ছোট বোন ,মেয়েটার বয়স আনুমানিক ৬ বছর হবে ।

এসেই মেয়েটি তার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাত

বাড়িয়ে দিয়ে বলে ভাইয়া জিলাপী আনোনাই তুমিনা কইছো আইজকা আমারে জিলাপী আইনা দিবা ।

ভাইয়ের মুখে কোনো কথা নাই চুপ করে দাড়িয়ে আছেে,

এরই মধ্যে ছেলেটার আরো একটি চার বছরের ছোট বোন

বেরিয়ে এসে বললো ভাইয়া ওরে না ওরে না আগে আমারে জিলাপী দিবা ।

এই বলেই ছোট বোনটা ভাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় আর কিছুক্ষন চুপ করে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ।

কোনো উত্তর না পেয়ে মেয়েটা বলে উঠলো” ভাইয়া তুমি আজকেও জিলাপী আনোনাই একলা একলাই খাইয়া আইছো ।

বোনের এই কথা শুনে ভাইটা ফুপিয়ে কেদে উঠলো ।

এই বলে বোন দুইটা ঘরের ভিতরে চলে যায় আর ছোট বোনটা মায়ের কোলে উঠে কান্না জুরে দেয় ।

ছেলেটার মা ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে কাদতে কাদতে বাইরে এসে বলে ,মেয়ে দুইটা অনেকদিন দরেই বলতেছিলো জিলাপী খাবে ।

ওগো বাপরে অহন অসুখ কাম কাজ নাই সংসারে অভাব ,

টেহা পয়সা হাতে নাই পোলাডারে বাইরে পাঠাইছিলাম বাসায় বাসায় গিয়অ কিছু সাহায্য চাইয়া আনতে ।

হয়তো পায়নাই মসজিদে খাবার পাইয়া তুইলা লইছে ।

ছোট মানুষ বুঝতে পারেনিই হুজুর আফনেরা তারে মাফ কইরা দিয়েন ।

এরই মাঝে ছোট মেয়েটা মায়ের কাছে কেদে কেদে নালিশ করছে

আর বলছে মা ভাইয়া আমাদেরকে প্রতিদিন মিছা কথা কয় ।ভাইয়া আজকেও আমাদের জন্য জিলাপী আনেনাই ।

ভাইটা কথাগুলা শুনছে আর মাথা নিচু করে ঠায় দাড়িয়ে আছে ।

হঠাৎ করে বোনটি চুপ করে যায় খেয়াল  করে তার ভাইয়ের শার্টের পকেট ভিজা ।

ছোট বানটি লাফ দিয়ে তার ভাইয়ের কোলে উঠে পকেটে হাক ঢুকিয়ে বের করে দেখে দুইটা জিলাপী ।

এবার মেয়েটি বলে ভাইয়া তুমি আনছো ,এই বলে দুই বোনের মুখে হাসি ফুটে উঠে ।

কিন্তু ছেলেটি ভ’য়ে চুপসে যায় ভ’য়ার্ত কন্ঠে বলতে থাকে ,

বিস্বাস করেন স্যার এইটা আমি চু’রি করিনাই  আমার ভাগে ইফতারের সময়

যে জিলাপী টা পরছিলো ঐ দুইটা বোনেদের জন্য পকেটে তুলে রাখছি ।

বিস্বাস করেন হুজুর এইটা আমি চু’রি করিনাই ।

আমি সত্যি রোজা রাখি ।

সবাই ঠায় পাথরের মতো দাড়িয়ে আছে হুজুর সাহেব ছেলেটাকে বুকে জরিয়ে দরে

মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর চোখের পানি ফেলছেন । সাথে যে লোকগুলা ছিলো তারাও সবাই স্বশব্দে কেদে উঠেন এবং

তার বাবার হাত দুইটা ধরে বলেন আমরা না জেনে আপনার ছেলের গায়ে হাত তুলেছি আপনি আমাদের মাফ করে দিয়েন ।

এ বলে লোকদুইটা মানিব্যাগ বের করে দিয়ে বললেন এখানে যা কিছু আছে তা দিয়ে

আপনার ফেমিলিকে বাচ্চা কাচ্চাকে কিছু কিনে খাওয়াবেন ।তারা লজ্জায় আর বেশীক্ষন

এখানে দাড়াতে পারলোনা ।দ্রত এখান থেকে চলে গেলো বেরিয়ে ।

আমাদের একটা সম’স্যা হচ্ছে আমরা সবসময় অপ’রাধ আর চোখের সামনে যা থাকে তাই দেখি

এবং বিস্বাস করি কিন্তু, অপ’রাধের পিছনের কোনো গল্প আছে কিনা আমরা তা জানতে চাইনা কখনো ।

রোজা র মাসে সত্য-ঘটনা অবলম্বনে তথ্যটি প্রকাশ করা হয়েছে

ধন্যবাদ ।

 

Leave a Comment