নবজাতক শিশুর যত্ন কিভাবে নিবেন – জেনে রাখুন

Spread the love

আমাদের পরিবারে যখনি নতুন প্রানে আসে বা নতুন অথিতি আসে আমাদের সকলেরই খুশির সীমা থাকেনা । পরিবারের সবাই অনেক আনন্দের সাথে তাকে গ্রহন করে নেই । সবাই আয়োজন করতে থাকে নতুন বাচ্চার আগমন উপলক্ষে । এতসব আয়োজনের মাঝেও হাজার রকমের চিন্তাএসে মাথায় ঘুরপাক খায় । নবজাতক শিশুর যত্ন নিয়ে প্রথমতো বাচ্চার মা এবং বাবার যে বাচ্চার  কিভাবে যত্ন নিবো । কখন তার জন্য কি করতে হবে ।কি করলে তার জীবন ভালোবাবে কাটবে এরকম চিন্তা সহ আরো হাজারো চিন্তা ! বাচ্চার খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে বাচ্চার পরিচর্যা যেমন গোসল,মালিশ সবদিক থেকেই আমাদের সবার চিন্তাভাবনা করে যত্নশীল হতে হয় । কে না চায় যে তার বাচ্চাটিও একজন সুস্থ সবল আদর্শ মানুষ হয়ে উঠুক । আর নতুন বাবা এবং মায়েদের জন্যতো এই লালন পালন এবং বাচ্চার যত্নের বিষয়টা খুবই চ্যালেন্জিং হয়ে দাড়ায় । তো আজকে আমরা জানবো নবজাতক শিশু সম্পর্কিত খুবই জরুরি কিছু কথা ।

 

অভিবাবকের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা

নবজাতক শিশুর কাছে আসা বা তাকে স্পর্শ করার আগে দুই হাত ভালোবাবে পরিস্কার করে নিন অথবা ধুয়ে নিন । সবসময় যদি আপনি হাত পরিস্কার না করতে পারেনে তাহলে আপনার কাছে হাত ধুয়ার জীবানুনাশক হ্যান্ড ওয়াশ অথবা জীবানুনাশক হ্যান্ড স্যানিটিইজার রাখুন এবং তা ব্যাবহার করুন ,যে বাচ্চার কাছে আসকে বা তাকে কোলে নিবে বাচ্চার বাবা-মা হিসাবে বা অভিবাবক হিসাবে বিষয়টা সবাইকে অবগত করুন । এতে বাচ্চার কোনোরকম জীবানু বা রোগ দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার কোনো ঝুাকি থাকবেনা ।

 

খাওয়ানোর সময় করনীয়

নবজাতক শিশুকে সঠিক সময় খাওয়ানো খুবই জরুরি বিষয় ।নতুন জন্ম নেওয়া বাচ্চাকে প্রতি দুই থেকে তিনঘন্টা পরে পরে অল্প অল্প করে খাওয়ানো ‍উচিৎ । প্রতিদিন বা ২৪ ঘন্টা সময়কালীন এর মধ্যে আপনার বাচ্চাকে ৮ থেকে ১২বার পর্যন্ত খাওয়ানো প্রয়োজন হতে পারে । শিশু জন্ম নেবার প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র বাচ্চার মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে । কারন,একমাত্র মায়ের বুকের দুধেই রয়েছে বাচ্চার জন্য সকল প্রকার পুষ্টি এবং ভিটামিন । এছাড়াও মায়ের দুধে রয়েছে এন্টিবডি, যা শিশুর শারীরিক ভাবে বেড়ে উঠা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তুলে ।

অনেক সময় বাচ্চার দুধ পায়না বা মায়ের বুকের দুধ খেতে পারেনা ,সেটা হতে পারে অনেক কারনে । তখন আপনি নিজেই কোনো দুধ বাজার থেকে না খাইয়ে আপনার বাচ্চার ডাক্তারের সাথে কথা বলে তাকে বাজার থেকে ফর্মূলা দুধ খাওয়াতে পারেন । এখানে একটা বিষয় সবসময় মাথায় রাখবেন, দুধ কিনার আগে ভালো করে দুধের মেয়াদ উর্তীনের তারিখ ,সঠিক পরিমান ও পরিমাপ এবং দুধের মান যাচাই করে নিতে হবে । আর যদি বাজার থেকে কেনা দুধ খাওয়ালে বাচ্চার কোনো সমস্যা হয় তাহলে অতিশীগ্রই আপনার আদরের বাচ্চাটিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান ।

 

ঢেকুর তোলানো বা বেবি বার্প

শিশুদের প্রতিবার খাওয়ানোর পরে এক প্রকার বিশেষ পদ্ধতিতে মায়েরা বা বাচ্চার আত্মীয় স্বজনরা তাকে ঢেকুর তুলিয়ে থাকে , যাকে ইংরেজি ভাষায় বেবি বার্প বলা হয়ে থাকে ।বাচ্চারা খাবার খাওয়ার সময় বাতাস গিয়ে ফেলে এ কারনে পেটে গ্যাস বা পেটে বাতাস জমে ব্যাথা অনুভুত হতে পারে । শিশুর পেটের এই অতিরিক্ত গ্যাস বা বাতাস ঢেকুর তোলার মাধ্যমে বের করিয়ে দেওয়া যায় । এটা কিভাবে করা হয় চলুন জানা যাক : ঢেকুর তোলানোর কৌশল -বাচ্চা কে আস্তে আস্তে আপনার বুকের কাছে এনে একটা হাত দিয়ে ধরে রাখুন । তার চিবুক আপনার বাম কাধে এলিয়ে দিন । আপনার অন্য হাত দিয়ে আস্তে আস্তে তার পিঠে টোকা দিন যতক্ষন না পর্যন্ত সে ঢেকুর তুলছে ।

 

বাচ্চার জিহ্বা পরিস্কার রাখা

মায়ের দুধ খাওয়ানোর ফলে বাচ্চার জিহ্বায় সাদা একটি পাতলা চামরার মতো স্তর পরে থাকে বা দেখা যায় । এ সাদা অংশটিকে ওরাল থ্রাস বলা হয়ে থাকে । এটা প্রায় সব বাচ্চারই থাকে ভয় পাওয়ার কিছু নাই । এটা পরিস্কার করে দিবেন না হলে বাচ্চার মুখে ঘা হয়ে যেতে পারে । তাই এটি পরিস্কার শুকনা নরম কাপর দিয়ে আস্তে আস্তে পরিস্কার করে দিন সপ্তাহে একবার ।

 

শিশুর যত্ন নখ কাটুন

ছোট নবজাতক বাচ্চাদের নখ খুব তাড়াতারি বড় হয়ে যায় । আর নিজের নখের আচরেই শিশুর শরীরে গভীর ক্ষত হতে পারে বা ইনফেকশন হতে পারে । আমরা সবাই জানি শিশুদের ত্বক খুবই সেনস্যাটিভ হয় তাই আচর থেকে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা বেশী হয়ে থাকে । তাই শিশুদের নখ কেটে রাখতে হবে । শিশু যখন ঘুমিয়ে যাবে তখন সাবধানে নখগুলো কেটে নিতে হবে । কারন বাচ্চা ঘুমিয়ে গেলে নড়াচরা বা কেটে যাবার ভয় থাকবেনা কোনো প্রকার । নখ কাটার জন্য বাচ্চাদের নখ কাটার বা কাচির মতো বাচ্চাদের ব্যবহারের নেইল কাটার  ব্যাবহার করুন এতে কেটে যাওয়ার ভয় থাকবেনা । এবং ব্যাবহার করার আগে তা অবশ্যই জীবানুমুক্ত করে নিতে হবে । সবচেয়ে ভালো সময় হলো আপনার বাচ্চা গোসলের পরে যখন ঘুমাবে তখন তার হাতের নখ খুবই নরম থাকবে তখন তার নখ কেটে  নিন ।

 

চোখের যত্ন

নবজাতক বাচ্চাদের চোখে প্রায়ই ময়লা জমে বা দেখা যায় । বাচ্চার চোখের ময়লা পরিস্কার করার জন্য ভুলেও আপনার খালি হাত লাগাতে যাবেন না । কুসুম গরম পানিতে জীবানুমুক্ত নরম কাপর বা তুলো ব্যাবহার করুন । কাপর বা তুলোটা ভিজিয়ে হালকাভাবে তার চোখে দরে পানিয়ে ঝরিয়ে তার চোখ মুছে ময়লাটা নিয়ে আসুন ।

 

নাক কান পরিস্কার রাখা

বাচ্চাদের নাক কান পরিস্কার করার জন্য জীবানুমুক্ত বাডস ব্যবহার করুন । শিশু যখন ঘুমিয়ে যাবে তখন সাবধানের সহিত তার নাক কান পরিস্কার করে দিন । খেয়াল রাখবেন সে যেনো কোনো প্রকার চুট না পায় । পরিস্কার করার আগে আপনি ডে কটন বাডসটা ব্যবহার করবেন সেটার মাথায় হালকা করে অলিভ ওয়েল লাগিয়ে নিন । অনেক সময় বাচ্চাদের নাকের সর্দির জন্য সে স্বাস প্রস্বাস নিতে পারেনা । তার স্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং দুধ টেনে খেতে পারেনা সে দিকটা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে ।

 

শিশুর শরীরে মালিশ করা-শিশুর যত্ন

নবজাতক বাচ্চার শরীর মালিশ করা খুবই উপকারী একটা ব্যাপার । এটি শিশুর শরীরের রক্ত সঞ্চালন ,হজম বৃদ্ধিতে, এবং শিশুকে ঘুমাতে সাহায্য করে । বাচ্চাকে গোসল করানোর আধাঘন্টা আগে  হাতে অল্প পরিমানে বেবি লোশন বা বেবি ওয়েল নিয়ে আস্তে আস্তে মালিশ করুন । এতে বাচ্চার শরীরে রক্তের সার্কুলেশন ভালো ভাবে হয় এবং আরাম অনুভব করে থাকে । শিশু ভালো ঘুম ঘুমাতে পারে ।

 

সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আনা-শিশুর যত্ন

আগেকার সময়ের নানী দাদাদের আমল থেকেই দেখা যেতো ,সকালবেলা বাচ্চাদের কে সূর্যের আলোতে নিয়ে বসে থাকতো ।

সূর্যের আলোতে আছে ভিটামিন ডি যা বাচ্চার শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় যা শরীরের হার বিকাশের জন্য সহায়তা করে এবং ক্যালসিয়াম এর ঘাটতি কমায় ।

 

গোসল এর সময়

নবজাতক বাচ্চাকে সাবধানতা অবলম্বন করে গোসল করাতে হবে । কেনোনা শিশুর কানে সাবান অথবা চোখে সাবান  ঢুকে যেতে পারে ।

তাই গোসলের আগে থেকেই সব জিনিস হাতের কাছে রাখুন যেমন শিশুর জন্য অল্প কুসুম গরম পানি,

বডি ওয়াশ বা বেবি সোপ ব্যবহার করুন ,ক্রিম অথবা বেবি লোশন ব্যাবহার করুন ,

বাচ্চাকে কি পরাবেন আগে থেকেই তা পরিস্কার করে রেডি করে  রাখুন ।

খেয়াল রাখবেন যেনো বাচ্চার নাকে অথবা কানে যেনো সাবান পানি না ঢুকে যায় এতে বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে ।

গোসল শেষ হলে বাবুকে নরম তোয়ালে দিয়ে জরিয়ে নিন এরপর বডি লোশন অথবা বডি ওয়েল দিয়ে

সারা শরীর ম্যাসেজ করে দিন  ।আরেকটা জরুরি কথা মনে রাখবেন বাচ্চার গোসল যেনো দুপুর ১২ টার মধ্যেই শেষ  করার ।

 

পেম্পারস্ অথবা ডায়পার পরানো

নবজাতক বাচ্চার যত্ন নেওয়ার আরো একটি ইম্পোর্টেন্ট দিক হলো পরিবর্তন বা চেইন্জ করা ।

বাচ্চারা যেহেতু দুধ বা ফর্মূলা খেয়ে থাকে তাই প্রতিদিন কম করে হলেও ৬ টা থেকে ৮ টা

ডায়পার বা পেম্পারস্ চেইন্জ করতে হয় ।ভেজা ডায়পার শিশুর জন্য খুবই ক্ষতিকর ,

ডায়পার যদি ভেজা থাকে তাহলে শিশুর ঠান্ডা লেগে যেতে পারে যা শিশুর জন্য খুবই মারাত্বক ব্যাপার ।

ভেজা আর অপরিস্কার ডায়পারের জন্য শিশুর ফুসকুরি হতে পারে ।

তবে এর জন্য আপনারা ডায়পার ক্রিম ব্যবাহার করতে পারেন ।

 

বাচ্চার পোশাক নির্বাচন-শিশুর যত্ন

নবজাতক বাচ্চার পোশাক বিষেশ সতর্কতার সাথে নির্বাচন করা উচিৎ ।

মোটা জাতীয় কাপর বা সিনথেটিক কাপর শিশুর ত্বক বা চামরার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে ।

শিশুর যত্ন নেওয়ায় খেয়াল রাখুন কাপরে কোনো ময়লা আছে কিনা যে কাপরটায় ময়লা দেখা যাবে

সেটা পরিহিত করার থেকে বিরত থাকুন ।

 

কোমল ডিটারজেন্ট বা পরিস্কার করার জিনিস

আমরা অনেক সময় দেখি আত্মীয় স্বজনেরা নতুন কাপর নিয়ে আসে নবজাতকের জন্য এগুলা আমরা না দেখেই পরিয়ে ফেলি

এটা একদমি ঠিক নয় ।

শিশুর জন্য কেনা বা নতুন পোশাক অথবা তার ব্যবহারের চাদর সমূহ ভালো  করে ধুয়ে নিন ।

জীবানুমুক্ত করার জন্য ধুয়ার সময় কাপরে কোমল ডিটারজেন্ট ব্যাবহার করুন ।

আমাদের দেশ যেহেতু ছয় মেীসুমী দেশ সেহেতু আবহাওয়া পরিবর্তন এর কারনে শিশুর শরীরে অনেক সমস্যা

দেখা দিতে পারে এমতো অবস্থায় না ঘাবরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান এবং ডাক্তারের পরামর্শ মাফিক চলুন ।

আশা করি আজকের  লেখাটি আপনাদের কাছে খুব ভালো লাগবে এবং হেল্পফুল মনে হবে ।সকলেই ভালো এবং সুস্থ থাকবেন ধন্যবাদ ।

 

Leave a Comment